মাদারগঞ্জে মরিচ চাষে অনিশ্চয়তা, শুকিয়ে মরছে একের পর এক গাছ

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা দ্রুত কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের খেত পরিদর্শন, রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন

মাদারগঞ্জে মরিচ চাষে অনিশ্চয়তা, শুকিয়ে মরছে একের পর এক গাছ

আকাশ মন্ডল মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি:

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় মরিচখেতে অজানা রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন কৃষকেরা। গাছে মরিচ আসতে শুরু করলেও হঠাৎ ডালপালা শুকিয়ে যাচ্ছে, কিছু গাছ আবার পুরোপুরি মরে যাচ্ছে। এতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলে আনতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের।

উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের বিনোদটঙ্গী এলাকার কৃষিজমিতে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সাতজন কৃষকের প্রায় পাঁচ একর জমির মরিচখেতে গাছ শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। গাছ রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছেন না তাঁরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মরিচগাছে ফল আসতে শুরু করায় এবার ভালো উৎপাদনের আশা করেছিলেন তাঁরা। ফসল বিক্রি করে পরিবারের খরচ মেটানো, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু গাছের এমন অবস্থা তাঁদের সেই প্রত্যাশায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত খেতগুলোতে বগি, পিউর ও প্রিমিয়াম জাতের মরিচ চাষ করা হয়েছে। কৃষকেরা জানান, প্রথমে কিছু গাছে শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। পরে ধীরে ধীরে আরও গাছ আক্রান্ত হতে থাকে। রোগের প্রকৃত কারণ বুঝতে না পেরে তাঁরা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করছেন। তবে সঠিক রোগ শনাক্ত না হওয়ায় কোন ব্যবস্থা নিলে গাছ বাঁচবে, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না।

স্থানীয় কৃষক আব্দুস সামাদ জানান, তিনি ৪৬ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গাছে মরিচ আসতে শুরু করায় ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে গাছে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করেও গাছ রক্ষা করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

আরেক কৃষক এনছ মণ্ডল বলেন, মরিচগাছের সমস্যা নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, এখন পর্যন্ত খেত পরিদর্শন করে সমস্যাটি সরেজমিনে পরীক্ষা করা হয়নি।

কৃষক শহীদুল ইসলাম ও নুর ইসলামও একই সমস্যায় উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত রোগের কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জমির বড় একটি অংশের ফসল নষ্ট হতে পারে। এতে তাঁদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আগামী মৌসুমের চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মাদারগঞ্জে ৭৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০০ হেক্টর বেশি জমিতে এ ফসল চাষ করেছেন কৃষকেরা। ফলে স্থানীয় কৃষকদের কাছে মরিচের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

কৃষকদের মতে, মরিচগাছ শুকিয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা এখন সবচেয়ে জরুরি। রোগটি ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, মাটির সমস্যা, পানি নিষ্কাশনের জটিলতা নাকি অন্য কোনো কারণে হচ্ছে, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই অনুমাননির্ভর ওষুধ প্রয়োগ না করে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ ও মাটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা দ্রুত কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের খেত পরিদর্শন, রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশা, সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো যাবে।

এখন কৃষকদের অপেক্ষা, কবে আক্রান্ত মরিচখেত পরিদর্শন করে সমস্যার কারণ নির্ধারণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সময়মতো সহায়তা না পেলে বিনোদটঙ্গী এলাকার এসব কৃষকের মৌসুমজুড়ে করা পরিশ্রম ও বিনিয়োগ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।