লালন আখড়ায় সাধুসঙ্গ, নাকি বাণিজ্যিক মেলা- কোনটি মুখ্য?

আমরা মেলার বিরোধিতা করছি না; আমরা সাধুসঙ্গের স্বকীয়তা রক্ষার কথা বলছি।

লালন আখড়ায় সাধুসঙ্গ, নাকি বাণিজ্যিক মেলা- কোনটি মুখ্য?

লালন আখড়া হয়েছে ‘লালন মাজার’। ফকির লালন সাঁই হয়েছেন ‘বাউল সম্রাট লালন শাহ্’। সাধুসঙ্গের জায়গায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘লালন মেলা’। আর সাধু-ফকিরদের ঐতিহ্যবাহী আখড়ার পরিচালনার দায়িত্বে সাধুসমাজের পরিবর্তে এসেছে ‘লালন একাডেমি’। নামের এই পরিবর্তনগুলো হয়তো সময়ের বিবর্তন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, লালন সাঁইয়ের দর্শন, সাধুসঙ্গের মর্মবাণী ও আখড়ার মূল চেতনা কতটা অক্ষুণ্ন আছে?

প্রতি বছর লালন সাঁইয়ের স্মরণে আয়োজিত সাধুসঙ্গের সময় আখড়াসংলগ্ন মাঠ ইজারা দিয়ে সেখানে বসানো হয় বাণিজ্যিক মেলা। এবারও মাঠটি ৪৬ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই ইজারাদারের বিনিয়োগ উঠে আসা এবং মুনাফা অর্জনের তাগিদ থাকবে। ফলে মাঠজুড়ে দোকানপাট, বেচাকেনা, মানুষের ভিড়, মাইকিং ও কোলাহল- সব মিলিয়ে বিশাল এক বাণিজ্যিক আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

কিন্তু এই আয়োজনের ভিড়ে সাধুসঙ্গ কোথায় দাঁড়ায়?

লালন সাঁইয়ের দর্শন তো কেবল গান, মঞ্চ কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দর্শন মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলতে বলে, আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবিকতার পথে আহ্বান জানায়। সাধুসঙ্গ হলো সেই দর্শন উপলব্ধি, ভাববিনিময় ও সাধনার এক বিশেষ পরিসর।

যেখানে সাধকের প্রয়োজন নির্জনতা, ভাবের পরিবেশ ও আত্মজিজ্ঞাসার অবকাশ, সেখানে হাজারো মানুষের কেনাবেচার কোলাহল সেই সাধনার পরিবেশকে কতটা সহায়তা করে?

সরল মনের কয়েকটি প্রশ্ন-

- আখড়াসংলগ্ন মাঠটি সাধু-গুরু, ফকির, ভক্ত-আশেকান ও লালন-অনুসারীদের সাধুসঙ্গের জন্য উন্মুক্ত রাখা যায় না কেন?

- সাধুসঙ্গের মূল আয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে বাণিজ্যিক মেলার জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করা যায় না কেন?

- মলালন সাঁইয়ের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাধু-ফকিরদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

- ঐতিহ্য সংরক্ষণের নামে যদি বাণিজ্যই মুখ্য হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম লালনের দর্শন জানবে কীভাবে- মঞ্চের গান থেকে, নাকি সাধুসঙ্গের জীবন্ত ঐতিহ্য থেকে?

মেলা হোক, মানুষের সমাগম হোক, লোকজ পণ্যের বেচাকেনাও চলুক। স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই আয়োজন যেন সাধুসঙ্গের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে না ফেলে।

ইজারার অর্থ রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে, মেলা মানুষের আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু লালন সাঁইয়ের দর্শন ও সাধুসঙ্গের ঐতিহ্যের মূল্য কি শুধু ইজারার অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব?

লালন আখড়া কোনো সাধারণ মেলার মাঠ নয়। এটি বাংলার লোকদর্শন, সাধনা, মানবতাবাদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। তাই আখড়ার ব্যবস্থাপনা ও মাঠ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক স্বার্থের পাশাপাশি সাধুসমাজের মর্যাদা, ভক্তদের অধিকার এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আমরা মেলার বিরোধিতা করছি না; আমরা সাধুসঙ্গের স্বকীয়তা রক্ষার কথা বলছি।

লালন সাঁইকে স্মরণ করার আয়োজন এমন হোক, যেখানে বাণিজ্যের কোলাহলে সাধনার সুর হারিয়ে যাবে না; বরং মানুষের মিলন, ভাবের আদান-প্রদান ও মানবিকতার চর্চায় তাঁর দর্শন আরও জীবন্ত হয়ে উঠবে।

লালন আখড়া সাধুসঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হয়ে থাকুক- শুধু বাণিজ্যিক মেলার ঠিকানা হয়ে নয়।