বকশীগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও গর্ভধারণ: মামলা তুলে নিতে শিক্ষকের হুমকি
শিক্ষক সেলিম মিয়া মামলা তুলে নেওয়ার জন্য দিনমজুর পরিবারটিকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া এক হতদরিদ্র দিনমজুরের কিশোরী মেয়েকে (১৭) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের মামলায় আসামীরা কারাগারে রয়েছে। এ ঘটনায় বর্তমানে ওই কিশোরী সন্তান প্রসবের শেষ মুহূর্তে রয়েছে। ন্যায়বিচার ও মামলা করার পর থেকেই আসামিপক্ষ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং খোদ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে অব্যাহত চাপ ও হুমকির অভিযোগ উঠেছে যার ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে অসহায় পরিবারটি।
থানা এজাহার, পুলিশ প্রতিবেদন ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর মো. মানিক মিয়ার স্ত্রীহীন সংসারে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল। তাঁর বড় মেয়ে (১৭) গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল এবং চলতি বছরে তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বখাটে মো. রোমান মিয়া ওরফে রশিদ (৩০) ও তার সহযোগীদের কুপ্রস্তাব এবং বিভিন্ন প্রলোভনে তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গত ০২/০১/২০২৬ তারিখ রাতে বসতঘরের একা পেয়ে রোমান মিয়া জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে কিশোরীর শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে বকশীগঞ্জ একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হলে চিকিৎসক তাকে গর্ভবর্তী বলে নিশ্চিত করেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা মানিক মিয়া বাদী হয়ে বকশীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী/২০২০) এর ৯(১)/৩০ ধারায় ০২ নম্বর মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ইতিমধ্যে মামলার এজাহারনামীয় আসামি রোমান মিয়া ও রাব্বি হাসানকে (২০) গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে।
মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীর বাবা দিনমজুর মানিক মিয়া জানান, আমার মেয়ের এহেন সর্বনাশ করার পর আসামির পক্ষ নিয়ে প্রতিবেশী সেলিম মাষ্টার আমাদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে আমার হাত-পা ভেঙে ফেলা হবে এবং পরিবারকে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো সময় তারা আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। আমি ও আমাদের পরিবারের লোকজন বর্তমানে আসামিদের ভয়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি ইতিমধ্যে বকশীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ৮৫জিস্ট, তাং- ১৯/০৯/২০২৬) করেছেন।
জিডি সূত্রে জানা যায়, মামলা দায়ের ও আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। গোপালপুর এলাকার মৃত রইচ উদ্দিন মাস্টারের ছেলে ও গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সেলিম মিয়া (৫০) মামলা তুলে নেওয়ার জন্য দিনমজুর পরিবারটিকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। গত ১১/০৯/২০২৬ তারিখে আসামিপক্ষীয় লোকজন প্রকাশ্যে বসতঘরের সামনে এসে হুমকি দেয় যে মামলা তুলে না নিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ও গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সেলিম মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কাউকে কোনো ধরনের হুমকি দিইনি বা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য কোনো চাপ সৃষ্টি করিনি।
অন্যদিকে, গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অভিযুক্ত শিক্ষক সেলিম মিয়ার সহদর বড় ভাই গোলাম ফারুক-এর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক ও দুর্ব্যবহার করে বলেন, এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেবো না, যা পারেন করেন।
এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মকবুল হোসেন জানান, এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে এবং এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পাওয়া গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনাগত সন্তান প্রসবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ১৭ বছরের এই কিশোরীর প্রসবকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার, যাতায়াত খরচ ও হাসপাতালে ভর্তির ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য দিনমজুর বাবার নেই। অনিয়মিত আয়ে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে প্রসবকালীন জটিলতা বা অস্ত্রোপচারের ব্যয় বহন করা এই অসহায় পরিবারের জন্য অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, নবজাতক ও কিশোরী মায়ের সুচিকিৎসা এবং পুরো পরিবারটির সার্বিক সুরক্ষার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
